Saturday, May 28, 2022
Homeইতিহাসসুলতান দাঊদ খান কররানীর পতন এবং বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত

সুলতান দাঊদ খান কররানীর পতন এবং বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত

সুলতান দাঊদ খান কররানীর পতন এবং বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত

 

সুলতান দাঊদ খান কররানীর পতন এবং বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত
সুলতান দাঊদ খান কররানীর পতন এবং বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত

১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাঊদ খান কররানীকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত করেন সম্রাট জালালউদ্দিন মুহম্মদ আকবর এবং বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রদেশসমূহকে ‘সুবা’ বলা হতো এবং মুঘল সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত প্রাদেশিক গভর্নরকে বলা হতো সুবাদার। সুবাদারগণ মুঘল বাদশাহর প্রতিনিধি হিসেবে প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। ১৫৭৬ সালে আকবর বাংলা বিজয় করলেও সমগ্র বাংলার উপর তিনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি। আকবর মূলত বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে এবং পূর্ব বঙ্গের সামান্য কিছু অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন ; প্রায় সমগ্র পূর্ব বঙ্গই ছিলো মুঘল নিয়ন্ত্রণের বাইরে । পূর্ব বাংলার বড় বড় অঞ্চলের জমিদাররা একজোট হয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ও মুঘলদের প্রতিরোধ করা শুরু করেন । পূর্ব বঙ্গের প্রতাপশালী জমিদাররা নিজেদের জমিদারিতে স্বাধীন ছিলেন, তাঁরা মুঘলদের কর দিতেন না ও মুঘল বাদশাহর আনুগত্যও স্বীকার করতেন না ; তাঁরা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলা কে মুঘল নিয়ন্ত্রণ থেকে এভাবেই রক্ষা করার প্রচেষ্টা করে যান বাংলার এই বীর জমিদাররা — ইতিহাসে তাঁরা ‘বারো ভূঁইয়া’ নামে খ্যাত। অনেকের মতে বারো ভূঁইয়া বলতে ১২ জন শক্তিশালী জমিদারকে বোঝায় ; আবার অনেকের মতে ‘বারো ভূঁইয়া’ কথাটি দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বোঝানো হয় না। বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ছিলেন সোনারগাঁওয়ের জমিদার ঈসা খাঁ (১৫২৯-১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দ)। বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা ছিলেন ঈসা খাঁ, ঈসা খাঁর পুত্র। মুসা খাঁ, রাজা প্রতাপাদিত্য, কেদার রায়, চাঁদ রায়, ফজল গাজী , রামকৃষ্ণ, পীতম্বর প্রমুখ।

ঈসা খাঁ (১৫২৯-১৫৯৯)
ঈসা খাঁর পিতামহ ভাগীরথী ছিলেন রাজপুত জাতির একজন ব্যক্তি। তিনি ভাগ্যান্বেষণের লক্ষ্যে অযোধ্যা থেকে বাংলায় এসেছিলেন। ভাগীরথী নিজ মেধা ও যোগ্যতাবলে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের অধীনে প্রশাসনিক কার্যে নিয়োজিত হন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে জমিদারিপ্রাপ্ত হন। ভাগীরথীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গজদানি কালিদাস সিংহ পিতার জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কালিদাস ইসলাম গ্রহণ করেন ও নিজের নামকরণ করেন সুলায়মান খাঁ। সুলায়মান খাঁয়ের সাথে হোসেন শাহী রাজবংশের শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহের মেয়ে শাহজাদি সৈয়দা মোমেনা খাতুনের বিবাহ হয় ও এভাবে সুলায়মান খাঁর শক্তি বৃদ্ধি ঘটে। এই সৈয়দা মোমেনা খাতুনের গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন বাংলার প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান বীরযোদ্ধা ঈসা খাঁ

বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত
বাংলায় মুঘল শাসনের সূত্রপাত

১৫৩৮ সালে হুমায়ুন প্রথম মুঘল বাদশাহ হিসেবে বাংলা বিজয়ের জন্য অভিযান পরিচালনা করেন এবং রাজধানী গৌড় দখল করেন। তিনি আটমাস বাংলায় অবস্থান করেন এবং এরপর ১৫৩৯ সালে দিল্লি ফেরার পথে বক্সারের নিকটবর্তী চৌসার নামক স্থানে বিহারের গভর্নর শেরখান শূরের অতর্কিত আক্রমণে পড়েন। ১৫৩৯ সালে চৌসারের যুদ্ধে সম্রাট হুমায়ুন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে কোনো মতে প্রাণ নিয়ে দিল্লিতে পলায়ন করেন। শেরখান শূর ‘শেরশাহ’ উপাধি ধারণ করেন ও নিজেকে বিহারের স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন।
১৫৪০ সালে শেরশাহ বাংলা দখল করেন এবং একই বছর কানৌজের নিকট বিলগ্রামের যুদ্ধে শেরশাহ হুমায়ুন কে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন এবং ভারতীয় উপমহাদেশে শূর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চলই শেরশাহের অধীনে আসে এবং এভাবেই আফগান নেতা শেরশাহ ভারতবর্ষে
আফগান শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্থায়ী ছিলো ১৫৫৫ সাল পর্যন্ত। ১৫৪৫ সালে শেরশাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জালাল খান ইসলাম শাহ নাম ধারণ করে শূরী সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং বাংলার উপর সম্পূর্ণভাবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। তখন সরাইলের জমিদার সুলায়মান খাঁ বাংলার উপর আফগান শূরীদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন এবং হোসেন শাহী রাজবংশের শেষ সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহের জামাতা হিসেবে বাংলার মসনদের উত্তরাধিকার দাবি করেন। এ নিয়ে ইসলাম শাহ শূরীর সাথে সুলায়মান খাঁ এর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় ও ইসলাম শাহ শূরী ও সুলায়মান খাঁ এর মধ্যে যুদ্ধ হয়। সুলায়মান খাঁ এই যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন এবং তাঁর দুই ছেলে ঈসা ও ইসমাইলকে ইরানি বণিকদের নিকট বিক্রি করে দেয়া হয়। ঈসা খাঁর চাচা কুতুব খাঁ বহু অর্থের বিনিময়ে ইরানি বণিকদের থেকে ঈসা কে মুক্ত করে আনতে সক্ষম হন।

আরও পড়ুন  সুলতান জালালুউদ্দিন মুহম্মদ শাহ

১৫৫৫ সালের ২৩শে জুলাই পারস্যের শাহ প্রথম তাহমাস্পের সহযোগিতায় হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। এরপরও বিহার ও বাংলা সহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে শূরী সাম্রাজ্য টিকে থাকে। ১৫৫৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি বাদশাহ হুমায়ুন দিল্লির অদূরে অবস্থিত দীন পানাহ দূর্গের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। বাদশাহ হুমায়ুনের মৃত্যুর খবর পেয়ে সুলতান আদিল শাহ শূরীর প্রধানমন্ত্রী হিমু সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন ও দিল্লির প্রশাসক তার্দি বেগ খান কে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা অধিকার করে নিজেকে দিল্লির স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেন ও ”বিক্রমাদিত্য” উপাধি ধারণ করেন। ১৩ বছর বয়সী শাহজাদা জালালউদ্দিন মুহম্মদ আকবর তখন সেনাবাহিনী সহ কাবুলে অবস্থান করছেন। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ১৫৫৬ আকবর সিংহাসনে বসেন সেনাধ্যক্ষ বৈরাম খান আকবরের রাজ-অভিভাবক (রিজেন্ট) নিযুক্ত হন। ৫ই নভেম্বর পানিপথের প্রান্তরে বৈরাম খানের নেতৃত্বাধীন মোঘল বাহিনী ও হিমুর বাহিনী মুখোমুখি হয়। ১৫২৬ সালের ২১শে এপ্রিল এই পানিপথের প্রান্তরেই লোদী রাজবংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেছিলেন আকবরের পিতামহ জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর। ৩০ বছর পর আবারও গর্জে উঠলো পানিপথ,, মুঘল সাম্রাজ্যের হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য।
পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমু পরাজিত ও নিহত হন এবং মুঘলরা বৈরাম খানের নেতৃত্বে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হয়। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমুর পরাজয়ের পর মুঘলরা শূরী সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। ফলে দীর্ঘদিন মুঘলদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ানো আফগান শূরীদের পতন ঘটে সম্রাট আকবরের হাতে।

তাজ খান কররানী বাংলার সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত হবার পর ঈসা খাঁ পিতার জমিদারী ফিরে পান এবং তাঁর জমিদারীর দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি শুরু থেকেই মুঘলদের তীব্র বিরোধিতা করেন ও আফগান বংশোদ্ভুত কররানী রাজবংশের সুলতানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ও বাংলার সুলতানদের সহযোগী হিসেবে শক্তি প্রয়োগ শুরু করেন। ঈসা খাঁ আফগান দলপতি ও স্থানীয় জমিদারদের সংগঠিত করা শুরু করেন মুঘলদের প্রতিহত করার জন্য।

১৫৭৬ সালে মুঘল সাম্রাজ্য ও বাংলা সালতানাতের মধ্যে সংঘটিত চূড়ান্ত যুদ্ধে (রাজমহলের যুদ্ধ) বাংলার সুলতান দাঊদ খান কররানী নিহত হন , নিহত হন দুর্ধর্ষ সেনাপতি কালাপাহাড় এবং এরই মধ্য দিয়ে পতন ঘটে স্বাধীন সুলতানি যুগের। বাংলা পরিণত হয় মুঘল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে বা সুবায়।

পূর্ববঙ্গের বড় বড় অঞ্চলের জমিদাররা মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান এবং মুঘলদের একপ্রকার নাজেহাল করেই ছাড়েন। ঈসা খাঁ মুঘলদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে কামরূপ ও ত্রিপুরার রাজার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। তিনি বেশ কয়েকটি যুদ্ধে মুঘলদের পরাজিত করেন। ঈসা খাঁর বীরত্বের জন্য সুলতান দাঊদ খান কররানী তাঁকে ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মান সিংহের সাথে অনুষ্ঠিত ঈসা খাঁর যুদ্ধে মান সিংহের ছেলে দুর্জয় সিংহ নিহত হন। শেষে মান সিংহ ও ঈসা খাঁ’র ভেতর একটি সমঝোতা হয় ।বলা হয়, মানসিংহ ও ঈসা খাঁ দুজনের মধ্যে তলোয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হবে — যে জয়ী হবে সেই বাংলা শাসন করবে। যুদ্ধ শুরু হলে তলোয়ারের প্রথম আঘাতেই ঈসা খাঁ মান সিংহের তরবারি দ্বি-খণ্ডিত করে ফেলেন। কিন্তু ঈসা খাঁ তাঁকে হত্যা না করে তাঁকে আরেকটি তরবারি গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। ঈসা খাঁ’র এই মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মান সিংহ ঈসা খাঁর সাথে লড়াই না করে তাঁকে আলিঙ্গন করেন ও বাদশাহ আকবরের কাছে ঈসা খাঁর বিশেষ প্রশংসা করেন। কথিত আছে, ঈসা খাঁ রাজা মান সিংহের সঙ্গে দিল্লিতে বাদশাহ আকবরের রাজসভায় উপস্থিত হন ও সম্রাট তাঁকে বিশেষ সমাদর করেছিলেন। ১৫৯৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর পুত্র মুসা খাঁ বারো ভূঁইয়াদের নেতা হন।

আরও পড়ুন  যুদ্ধ না শান্তি চাই

১৬১০ সালে বাদশাহ সেলিম নূর উদ্দিন মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান মুসা খাঁ কে পরাজিত করার মাধ্যমে খান বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। মুসা খাঁ পরাজিত হলে অন্যান্য জমিদাররা মুঘল কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সুবাদার ইসলাম খান পূর্ববঙ্গে মুঘল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ১৬১০ সালে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সম্রাটের নামানুসারে তিনি ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। এভাবেই ঢাকা শহরের প্রতিষ্ঠা করেন সুবাদার ইসলাম খান। তিনি ‘দোলাই খাল’ খনন করেছিলেন।

বাংলায় মুঘল শাসনঃ___বাংলায় মুঘল শাসনকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

(১) সুবাদারী শাসন (১৫৭৬ – ১৭১৭)

ও (২) নবাবী শাসন (১৭১৭ -১৭৫৬)

সুবাদারি শাসনঃ

সুবাদার ইসলাম খান (১৬০৮-১৬১৩):- বারো ভূঁইয়াদের দমন করে সমগ্র বাংলাকে মুগল শাসনাধীনে নিয়ে আসেন। ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেন ও ঢাকার নামকরণ করেন ‘জাহাঙ্গীরনগর’।

কাসিম খান জুয়িনী(১৬২৮-১৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) :- সম্রাট শাহ জাহানের শাসনামলে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলে। এসময় পর্তুগিজদের অত্যাচার বেড়ে গেলে সম্রাট শাহ জাহান তাদের বিতাড়িত করার নির্দেশ দেন।সুবাদার কাসিম খান জুয়িনী বাদশাহর নির্দেশে পর্তুগিজদের হুগলি থেকে উচ্ছেদ করেন।

শাহজাদা শাহ সুজাঃ মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা শাহ সুজা বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

মীর জুমলাঃ- বাদশাহ আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সাল পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ছিলেন মীর জুমলা। তিনি তাঁর শাসনামলে বিনা যুদ্ধে কুচবিহার মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন ; এসময় সম্রাটের নামানুসারে কুচবিহারের নামকরণ করা হয়েছিলো ‘আলমগীরনগর’। মীর জুমলা ঢাকা গেইট (অপর নাম-রমনা গেইট) নির্মাণ করেন। তিনি আসাম যুদ্ধে কামান ব্যবহার করেছিলেন যা ওসমানী উদ্যানে সংরক্ষিত আছে।

শায়েস্তা খানঃ- শায়েস্তা খান সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে দুই দফায় মোট ২২ বছর বাংলা শাসন করেন। তিনি ১৬৬৪ থেকে ১৬৭৮ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় এবং ১৬৮০ থেকে ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় বাংলার সুবাদার হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তিনি চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ দখল করেন এবং পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের এ অঞ্চল থেকে উৎখাত করেন। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ার ও ঐতিহাসিক স্টুয়ার্টের মতে, শায়েস্তা খানের আমলে দ্রব্যমূল্য এত কম ছিল যে ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেতো। তিনি স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ ও উৎকর্ষে ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্থাপত্য শিল্পের উন্নতির জন্য শায়েস্তা খানের সময়কালকে বাংলায় মুঘলদের স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

নবাবী শাসনঃ

বাদশাহ আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হওয়া শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে গভর্নর ও স্থানীয় নেতারা স্বাধীনতা ঘোষণা করা শুরু করেন। বালাজি বিশ্বনাথ পেশোয়ার নেতৃত্বে প্রবল প্রতাপে শুরু হয় মারাঠাদের সাম্রাজ্য বিস্তার। দুর্বল অকর্মণ্য মুঘল বাদশাহ মুহম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮) এর শাসনামলে ১৭৩৯ সালে পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে কোহিনুর হীরা ও ময়ূর সিংহাসন সহ প্রচুর ধন-দৌলত লুট করে পারস্যে নিয়ে গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন  বঙ্গ বা বাংলা নামের উৎপত্তি অনুসন্ধানে

নবাব মুর্শিদকুলী খান(১৭১৭-১৭২৭)

মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হতে থাকলে সুবাদার মুর্শিদকুলী খানের শাসনামলে বাংলা সুবা প্রায় স্বাধীন হয়ে পড়ে। মুর্শিকুলী খান হলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব। তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। উল্লেখ্য যে, মুর্শিদকুলী খানের শাসনামলে বাংলা সুবা স্বাধীন ও অভ্যন্তরীণ শাসনে মুঘল নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে গেলেও নবাবী বাংলা কে স্বাধীন রাজ্য বলা যায় না ; কেননা বাংলার নবাবরা স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করলেও দিল্লির মুঘল বাদশাহকে কর প্রদানপূর্বক দিল্লির বাদশাহর প্রতি মৌখিক আনুগত্য প্রদর্শন করতে হতো । এসময় মুঘল শাহী দরবারে সবচেয়ে বেশি কর আসতো বাংলা থেকে। এছাড়া বাংলার নবাব হওয়ার জন্য বাদশাহর অনুমোদন ও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হতো। মুঘল বাদশাহর অনুমোদন ব্যতীত বাংলার নবাব বৈধ বলে গণ্য হতেন না।
মুর্শিদকুলী খানের কোনো পুত্রসন্তান জীবিত না থাকায় তিনি মৃত্যুর আগে তাঁর দৌহিত্র‍্য সরফরাজ খাঁ কে উত্তরসূরী মনোনীত করেছিলেন।

নবাব সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খান(১৭২৭-১৭৩৯):-

মুর্শিদকুলী খানের মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র‍্য সরফরাজ খাঁ বাংলার মসনদে আসীন হলে তাঁর বাবা (মুর্শিদকুলী খানের জামাতা) সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খান এর বিরোধিতা করেন। সরফরাজ খাঁ সিংহাসনে বসলে তিনি সংবাদ পান তাঁর পিতা সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খান ও সুজাউদ্দিনের সহকারী আলীবর্দী খাঁ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছেন। মায়ের অনুরোধে পারিবারিক সম্মান রক্ষার স্বার্থে সরফরাজ খাঁ স্বেচ্ছায় নিজ পিতার কাছে সিংহাসন ছেড়ে দেন এবং সুজাউদ্দিন বাংলার নবাব হন। সুজাউদ্দিন মৃত্যুর পূর্বে নিজ ছেলে সরফরাজ খাঁ কেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।

নবাব সরফরাজ খাঁঃ ১৭৩৯ সালে ‘আলা-উদ-দৌলা-হায়দার জঙ্গ’ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে বসেন সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খানের পুত্র ও মুর্শিদকুলী খানের নাতি সরফরাজ খাঁ। ১৭৪০ সালে সরফরাজ খাঁ’র অধীনস্থ বিহারের গভর্নর আলীবর্দী খাঁ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং সরফরাজ খাঁ-কে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে নিজে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব হন।

নবাব আলীবর্দী খাঁ (১৭৪০-১৭৫৬):- ১৭৪০ সালে সরফরাজ খাঁকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করে বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল করেন আলীবর্দী খাঁ। তাঁর শাসনামলে নাগপুরের মহারাজ রঘুজী ভোসলের নির্দেশে সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে মারাঠারা বাংলা আক্রমণ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকে। ইতিহাসে মারাঠাদের এই আক্রমণ বর্গির হানা নামে পরিচিত। আলীবর্দী খাঁ মারাঠাদের সাথে চুক্তি করে বর্গি আক্রমণ থেকে বাংলাকে রক্ষা করেন।

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাঃ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ উদ্-দৌ লার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয় ও বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের ১জন্য অস্তমিত হয়।

✍️✍️ লেখকঃ- রাজিত তাহমীদ জিত

তারিখ- ০১/০৪/২০২২

তথ্যসূত্রঃ
০১। Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1875
০২। Social History of Bengal – DC Sanyal
০৩। Hindu-Muslim relations in Bengal: medieval period – Jagadish Narayan Sarkar,
০৪। History of the Muslims of Bengal
০৫। তারিখ-ই-ফিরিশতা
০৬। The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760 – Richard Maxwell Eaton
০৭। আমার সোনার বাংলাদেশ-মুহম্মদ হাবিবুর রহমান
০৮। বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব ও বিকাশ এবং একটি নতুন ধারার গোড়াপত্তন – মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক
০৯। History of Medieval India (Muslim Rule in India) – V.D. Mahajan
১০।বাংলার বারো ভূঁইয়া সমাচার-শেখ মাসুম কামাল
১১।রিয়াজ-উস-সালাতিন – গোলাম হোসেন
১১।উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য বিভিন্ন সাইট

কপিরাইটঃ Rajit Thamid jeet

Shafiqul Islam
Shafiqul Islamhttps://www.uipoka.com
মানুষ সব সময়েই ছাত্র, মাস্টার বলে কিছু নেই। এটা যে বুঝবে – সে সব সময়ে সামনে এগিয়ে যাবে
RELATED ARTICLES

Most Popular

Related articles